img

কাফরুলে যুবদল কর্মীকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রোববার (২৬ জুলাই) পর্যন্ত অন্তত ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগ ৫ ও থানা পুলিশ ৩ জনকে গ্রেফতার করে। সে হিসাবে শুটার ৫ জনের মধ্যে ৪ জন গ্রেফতার হয়েছে। 

থানা ও ডিবি সূত্রে জানা গেছে, কিলারদের ৫ লাখ টাকা দিয়ে ভাড়া করা হয়। তবে মাত্র ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। রাতের মধ্যে অন্যদেরও গ্রেফতার করা হতে পারে। এ বিষয়ে সোমবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে। 

কাফরুল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, শুটার চঞ্চলসহ মোট ৩ জনকে গ্রেফতারের তথ্য তিনি জানেন। ঘটনার দিন শুক্রবার চঞ্চল এবং রোববার জিহাদ ও মাসুম নামে আরও দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে জিহাদ মামলার এজহারভুক্ত আসামি ও মাসুমের নাম তদন্তে বেরিয়েছে। আর কারও গ্রেফতারের বিষয়টি তার জানা নেই।

এদিকে, ডিবির একটি সূত্র জানায়, তারা শনিবার ৪ জন ও রোববার ১ জনকে গ্রেফতার করেছে। রাতের মধ্যে কিলারদের ভাড়া করা হাফিজুর রহমান হাফিজ ও পলাতক হাসানকেও গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। দুটি মামলার মধ্যে ডিবি হত্যাকাণ্ডের ও থানা পুলিশ অস্ত্র আইনের মামলা তদন্ত করছে। তবে থানা পুলিশের দুজনকেও ডিবি জিজ্ঞাসাবাদ করবে। এছাড়া অস্ত্র মামলায় রিমান্ডে থাকা চঞ্চলকেও হত্যাকাণ্ডের মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখাবে।

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাতে রাজধানীর কাফরুলে দুর্বৃত্তদের গুলিতে যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী ওরফে পারভেজ নিহত হয়। এ ঘটনায় তার ভাই চারজনের নাম উল্লেখ ও ৪-৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করেছে। এছাড়া পুলিশ অস্ত্র আইনে একটি মামলা করে। অস্ত্র আইনের মামলায় শুটার চঞ্চল মোল্লা রিমান্ডে রয়েছে।

পুলিশ ও ডিবি সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাতে চঞ্চল মোল্লাকে স্থানীয় জনতা মারধর করে পিস্তলসহ পুলিশে হস্তান্তর করে। পরদিন শনিবার ডিবি অভিযান চালিয়ে শুটার জিয়ারুল হক মোল্লা ওরফে রাজু, নাহিদ হাসান ওরফে মেহেদী হাসান এবং সহযোগী সাফিন ছৈয়াল ওরফে সাফিন আহম্মেদ ও আলী হোসেনকে গ্রেফতার করে। এর মধ্যে নাহিদ পিস্তুলটি অন্য একজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে শুটারকে দেয়। সাফিন ও আলী ঘটনাস্থল রেকিসহ সার্বিক বিষয়ে শুটারদের সহযোগিতা করে।

ডিবির একটি সূত্র জানায়, গ্রেফতার জিয়ারুল মোল্লা ওরফে রাজু প্রায় ৯ বছর কাফরুল এলাকায় ছিল। সেখানে শ্রমিক লীগের নেতা ছিল। এলাকায় থাকার ফলে স্থানীয়দের সঙ্গে মোটামুটি তার বেশ সখ্যতা ও জানাশোনা। কিলারদের কয়েকজনকে তার সঙ্গে দেওয়া হয়, এলাকাটা পরিচিত করিয়ে দেওয়ার জন্য। 

সূত্রটি আরও জানায়, মূলত উদ্দেশ্য ছিল হাফিজুর রহমান বাবুকে শুট করা। তবে তারা অপরিচিত হওয়ায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায়। তারা অপিরিচত হওয়ায় সবার নজরে পরে যায়। বিষয়টি হাফিজুর রহমান বাবুরও নজরে পড়ে। তখন ইউসুফ তাদের কাছে গিয়ে পরিচয় জানতে চাইল পিস্তল বের করে গুলি করে দেয়। পরে পাঁচজনই ফাঁকা ফায়ার করতে করতে দৌঁড় দেয়। ফায়ারের একপর্যায়ে শুটার চঞ্চলের বন্দুকটা লক হয়ে গেলে স্থানীয়দের হাতে ধরা পরে যায়। অন্যরা শুটাররা দুই-তিন রাউন্ড ফায়ার করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

ডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, হত্যাকাণ্ডের পর মিরপুর-১ নম্বরে তারা জড়ো হয়। সেখানে স্বেচ্ছাসেবক দলের হাফিজুর রহমান হাফিজ তাদের সঙ্গে যোগ দেন। তারা একটা অটোরিকশায় ওঠে। জিয়ার কাছে যে পিস্তলটি ছিল সেটি হাফিজ নিয়ে নিয়ে নেয়। পরে তাদের দ্রুত ঢাকা ছাড়তে বললে, গাবতলী গিয়ে বাসে করে মাগুরার শালিখাতে চলে যায়। সেখান থেকে জিয়া আর হাসান দুজন একসসঙ্গে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে যায়।

ডিবি জানায়, আগেই তাদের অবস্থান শনাক্ত করে ধরতে অভিযান করা হয়। অভিযান চালিয়ে জিয়াকে ধরতে পারলেও হাসান পালিয়ে যায়। এছাড়া আলী হোসেনকেও ধরা হয়। এই আলী হোসেন হলো জিয়ার আত্মীয়। তিনি হত্যাকাণ্ডের সময় উপস্থিত ছিলেন না, তবে ঘটনার পরে শুটাররা তার কাছে থেকেই সব খবর নিতে থাকেন। ঘটনাস্থলের কি অবস্থা, পুলিশ কতটুকু মুভ করছে, ডিবি মুভ করেছে কিনা, কয়জন মারা গেছে, মামলা হয়েছে কিনা- মূলত হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী বিষয়গুলো তার কাছ থেকে নিচ্ছিল।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এ মাসের ৬ তারিখেও একটি গ্যারেজে যুবদল নেতা বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন হাফিজ। দুটি পিস্তলও এনে কিলারদের দিয়েছিলেন তিনি। তবে ওইদিন ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা থাকায় এবং একটি পিস্তুলের গুলি বেরিয়ে যাওয়ায় সেই চেষ্টা ভেস্তে যায়। পরবর্তীতে শুক্রবার হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া চার শুটারকে ঘটনার আগে ‘হোটেল প্রাইম’-এ এনে রাখা হয়। হোটেলের খাতায় ৩ জনের নাম লেখা থাকলেও রুমে ৪ জন অবস্থান করেন। পরবর্তীতে চঞ্চল এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সেখানেই হত্যার পরিকল্পনা ও স্থান নির্ধারণ করা হয়। কিলারদের ৫ লাখ টাকা দিয়ে ভাড়া করা হয়। তবে মাত্র ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। 

হোটেলটির মালিক সুমন আহমেদ জানিয়েছেন, ২৩ জুলাই দুপুর ১টা ১২ মিনিটের দিকে ওই যুবকেরা হোটেলে আসেন। তারা নিজেদের যশোরের সিটি কলেজপাড়া এলাকা থেকে চাকরির সন্ধানে এসেছেন বলে জানান এবং তিনজনের আলাদা জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জমা দেন। এনআইডি অনুযায়ী তাদের পরিচয় ছিল, মাহাদী হাসান রিয়াদ, তানভির ইসলাম মোমিন ও সাইফুল ইসলাম ইমন। পরিচয়পত্র জমা দেওয়ার পর তারা ৯ তলার ৯০৩ নম্বর রুমে ওঠেন। এর একদিন পর রাতে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ এসে সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। হোটেল মালিকের ধারণা, তারা যে এনআইডি কার্ডগুলো জমা দিয়েছিল, সেগুলো ভুয়া ছিল।

ডিবি পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. রাঁকিব খান যুগান্তরকে জানান, থানা ও ডিবি ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও আসামি গ্রেফতারে চেষ্টা চালায়। ঘটনার সঙ্গে রাজনীতি নয়, স্থানীয় দখল, আধিপত্য ইত্যাদি সম্পৃক্ত। যেহেতু ঘটনাটা ঘটছে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের মধ্যে, একটি গোষ্ঠী রাজনীতিকে টেনে এনে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চাচ্ছে। তবে ঘটনার সঙ্গে যেই সম্পৃক্ত হোক তাদেরকে গ্রেফতার করা হবে।

এই বিভাগের আরও খবর